Skip to main content

মহা আলেয়া - দলছুট পাখি ( চম্পা সর্দার )

সকাল থেকে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে।
আজ মহালয়া-
সরো, লক্ষ্মী, কেতো, গণা মায়ের পাশে শুয়েই দূর থেকে ভেসে আসা বীরেন্দ্র কৃষ্ণের মহালয়া শুনেছে। ওদের মনে এক আনন্দের রেশ। পুজোর প্যান্ডেলগুলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। দোকানগুলোতে কত ভিড়! কত রঙিন রঙিন সুন্দর জামাকাপড়! মা বলেছে এবার একটু আলাদা রকমের পুজো কাটাবে ওরা। সেই আনন্দেই চার ভাইবোন আহ্লাদে আটখানা।
বাবার উপর অবশ্য ওদের খুব একটা ভরসা নেই। বাবা তো যেখানে সেখানে নেশা করে পড়ে থাকে।

চারজনে গোল হয়ে বসে অপেক্ষা করছে মায়ের হাতের রান্না খাবার জন্য। বৃষ্টির জন্যই আজ একটু দেরি হয়ে গেল রান্নাটা শেষ হতে।
গরম গরম পাঁচমিশেলী সব্জির ঝোল আর খুদের ভাত।
ছোট ছোট কচি হাতগুলো গোগ্রাসে গিলতে থাকে সেই মহা প্রসাদ একটা তোবড়ানো গামলা থেকে।

তিনটে আধলা ইটের তৈরি নিভন্ত উনুনটায় তখনও কিছুটা কুড়ানো কাগজ আর কাঠের আগুন। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া ছেঁড়া বিছানাগুলো সেই তাপে শুকোতে ব্যস্ত উমা, ওদের মা।
- মা, তুমিও একটু খাও। দেখো কি ভালো হয়েছে তরকারিটা আজ।
- আমার পেটে ব্যথা করছে এখন। তোরা খেয়ে খেলা কর।
- বিকেলে আজ নতুন জামা দেবে বলেছিলে, সত্যি দেবে তো?
জিজ্ঞাসা করে সরো।
- বিকেল হলেই দেখতে পাবি।

আজ যেন মায়ের মুখে হাসিটা নেই। অথচ মা কত ভালো রান্না করেছে আজ। বিকেলে নতুন জামা হবে।
লক্ষ্মী ভাবে মনে মনে। গণার এখনো দুধের নেশা। ভাত ছেড়ে মায়ের কোলের উপর এসে আঁচলটা সরিয়ে চামড়া সর্বস্ব স্তনের বোঁটায় মুখ দেয়।
হঠাৎ উমা এক ঝটকায় গণাকে কোল থেকে নামিয়ে ঠাস করে এক চড় মারে।

- মেরে ফেল আমাকে মেরে ফেল। সবকটাতে মিলে আমার যেটুকু হাড় চামড়া আছে চুষে খা। বলে এক লাথিতে উনুনের ইটগুলোকে ছড়িয়ে ফেলে।

পাশের রেলিং-এ হেলান দিয়ে গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে ছিল ভোলা।
- আজ কি বাচ্চাদের গায়ে হাত না তুললেই নয়।
বলেই আবার নেশায় চোখদুটো বুজে ফেলে ভোলা।
কেতো এসে ভয়ে ভয়ে বাবার পাশে চুপ করে বসে।

একটা কালো গাড়ি এসে থামে ফুটপাত ঘেঁষে। জড়ির শাড়িতে ঝমমল করতে করতে নেমে আসে এক সুন্দরী মহিলা। পিঁচ করে একমুখ পান চিবানো থুতু ফেলে লাল দাঁতের হাসি নিয়ে দাঁড়ায় সরো আর লক্ষ্মীর সামনে। হাতে একটা বড় প্লাস্টিকের ব্যাগ।

- দেখোতো মামনিরা এগুলো তোমাদের পছন্দ কিনা।
বলে দুজনের সামনে দুটো লাল রঙের ফ্রক মেলে ধরে।
খুশিতে চোখ চারটে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
- পরে নাও, পরে নাও এগুলো। তারপর চলো আমার সাথে। অনেক সাজের জিনিস কিনে দেবো। পুজোতে পরে ঘুরতে যেতে হবে না?

মায়ের নিঃশ্চুপ চোখে সম্মতির আভাস পেয়ে সরো, লক্ষ্মী নতুন জামাদুটো পড়তে থাকে। আগের বছর পাড়ার দাদারাও দিয়ে গেছিলো নতুন জামা, তবে এত সুন্দর ছিল না।
সরো, লক্ষ্মীর হাত ধরে ঝলমলে সুন্দরী গাড়ির উঠতে উঠতে বলে-
- চলি গো উমা, ভালো থেকো। ভোলা, মাঝে মাঝে যেও আমার গরিবখানায়, এবার থেকে তোমারটা পুরো ফ্রী।

উমা যেন আজ একটু বেশি রকমের শান্ত হয়ে গেছে। কেতোটা অবাক হয়ে ভাবছে গতবছর তো তার আর গণারও নতুন পোশাক হয়েছিল। এবার শুধু দিদিদের? কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো কথা জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না।
উমা গণাকে কোলে নিয়ে চামড়ার বোঁটাটা মুখে দেওয়ায়। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে চলতে থাকা কালো গাড়িটার দিকে। কষ্টে না তৃপ্তিতে চোখদুটো বুজে আসে বারবার বুঝতে পারে না।
হঠাৎই একটা গাড়ির হর্ণে সম্বিৎ ফেরে উমার।

বছর পঞ্চাশের এক ভদ্রলোকের সাথে গাড়ি থেকে নামেন বছর চল্লিশের এক ভদ্রমহিলা।
কেমন যেন এক কালো মেঘের মতো মুখ ওই ভদ্রমহিলার। কেতো ভাবে এরা নিশ্চয়ই ওদের জন্য নতুন জামা এনেছে। কিন্তু হাতে কোনো ব্যাগ নেই কেন!

- উমা, তোমার সঙ্গে তো আগে অনেকবার এই ব্যাপারে কথা হয়েছে। কি ভাবলে বলো?

ভদ্রলোকের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে উমা ল্যাংটো গণাকে ভদ্রমহিলার কোলে তুলে দেয়।
গণাকে কোলে নিয়ে ওই মহিলা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় গাড়ির দিকে, আর ভদ্রলোক একটা কাগজের খাম এগিয়ে দেয় উমার দিকে। গাড়িটা চলে গেলে হঠাৎই বুকে এক টনটনে যন্ত্রণা অনুভব করে উমা। চামড়া সর্বস্ব স্তন থেকে দুধ গড়িয়ে পড়ছে একটানা।

রাস্তার আলোগুলো জ্বলে উঠতে থাকে একএক করে।
কেতোর আজ অবাক হবার পালা। কিন্তু পাঁচ বছরের ছেলেটার মনের হদিস বুঝি স্বয়ং ভগবানও টের পান না। নেশায় বুঁদ বাবার চোখ আর মেঘ থমথমে মায়ের মুখ এক অজানা ভয়ের সঞ্চার করে কেতো মনে। ধীরে ধীরে উঠে সে পাশেই শিয়ালদা স্টেশনে এসে দাঁড়ায়। এত লোকের মাঝে কেউ লক্ষ্যও করে না কেতো কখন চেপে বসেছে দূরপাল্লার ট্রেনটায়।

রাত বাড়ে, একসময় নিস্তব্ধ হয় শহরের কোলাহল। কুকুরের চিৎকার, মাতালের প্রলাপ, বারোয়ারি নেশায় বুঁদ হয় রাত। নিয়মের মাপে সকাল হয়...

ভোরে কর্পোরেশনের সাফাই কর্মীরা দেখে রাস্তায় যাযাবর উমার রক্তাক্ত, পিষ্ট দেহটা। খবর দেয় স্থানীয় থানায়। ভোলা তখনও গভীর ঘুমে কাতর, হাতে ধরা একটা সাদা খাম...

পাড়ার প্যান্ডেলে আজ মা দুর্গা এসেছে, চার ছেলেমেয়ে সাথে নিয়ে। খবরের কাগজে মোড়া মুখ। চক্ষুদানের আগে মায়ের মুখ দেখা বারণ...

Comments

Popular posts from this blog

Drawing , page 1

Sunita Mukherjee , from Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Madhumonti Paul , from Kalpography Phtotography and Drawing Department of Mrittikaparibar Drawing - Ruhul Amin , From Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Drawing - Adarsha Mondal , from Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Drawing - Tanmay Sinha , From Kalpography , Photograpy and Drawing Dept. of Mrittikaparibar drawing - Ankita Maji, from - Kalpography ( Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar )

বিসর্জন - আশিষ মেটে

ক্ষত বিক্ষত পাহাড় মাকড়সা জালে ঢাকা, রক্তস্রোত নদী, মৃত অরণ্যের চিত্র লেখা । শরৎ মেঘে নকশা ছবি, ভাসে ছোট্ট মেয়ের মুখ; বারুদে গন্ধে দম বন্ধ, ফেটে যাচ্ছে বুক; জ্বলন্ত শরীরের চলন্ত গুলির আওয়াজ, থমকে দাঁড়ায় কান্না তাঁর থামে না; ক্ষমা করিস মা, নিয়ে যেতে পারলাম না তোর পূজার সাজ- ছোট্ট মেয়েটি বার বার জিজ্ঞাসা, বাবা কবে আসবে মা? পুষ্পাঞ্জলি শেষ, চোখের জলে দুর্গামা; দিনের প্রতিটা মুহূর্তে আতঙ্ক; যোগ মেলে না জীবনের শেষ পৃষ্ঠার অঙ্ক । বিসর্জন বেদনার গান হৃদয়ের বাজে; ভারতমাতার দীপ  জ্বালিয়ে ঘরে ফিরলো তেরঙা সাজে।।

এসো চিন্ময়ী মা - মৌলী বণিক

অশ্রুরঙের ছবি দেখি কেন মা দুর্গা তোর চোখে? সব রঙ হারিয়ে তুই ডুবেছিস কি হতাশ শোকে? সভ্য পৃথিবী কক্ষগতি বদলে ছুটছে আদিম অন্ধকারে- স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ধর্ষিত গুহামানবের হিংস্র হুহুঙ্কারে। ধিকিধিকি রোষানলে জ্বলছে দেখি পাপভারে ন্যুব্জ ধরা, তবু ধম্মনেতাদের রক্তচক্ষু ভয়ে ধম্মজুজুরা আধমরা। নারীর শালীনতা ঘোমটা বোরখা কিছুই আজ রক্ষিত নয়; মহিষাসুররা রক্তবীজের বংশ- ধর্ষণ, হত্যায় লেখে পরিচয়। অনাচার ভ্রষ্টাচারের ধারা বিবরণী জমে ধূসর হয় পান্ডুলিপি অসহায় হতাশায় দলাদলি মারামারি- নাম দেই বিধিলিপি। কাদা ছোঁড়াছুড়ি, মিথ্যের চমক জাদুগরী, কথার ফুলঝুরি তাতে আর কিছু না হলেও হয় নেতার বৈভব ও রাজপুরী। ভক্তের মুখোশ পরা এসেছে যারা মৃন্ময়ী রূপে প্রণাম করে, রাতের আঁধার ঘরে সেই চিন্ময়ীরূপকে ক্রূশবিদ্ধ করে । দূর্গতিনাশিনী তোর বিলাসী দশভুজা সংহারী রূপ চাইনা মাগো, মন্দির বাইরে এই সমাজে দ্বিভুজা চিন্ময়ী রূপে মা তুমি জাগো।