Skip to main content

দুগ্গা ভাসান - মৌলী বণিক

ফুলুপিসির কি যে হল, কেউ বলতে পারেনা; এমন আশ্চয্যিকথা কে কবে শুনেছে! দিব্যি ভালো মানুষ, হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, ঠোঙা বানাতে বসে একেবারে পরপারে পাড়ি দিলে ! হসপিটালের ডাক্তার ভালো করে দেখে ডেথ্ সার্টিফিকেটে লিখলেন ''সাডেন ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।''

বিজনপুর রেলস্টেশনের পেছনের বস্তিতে ফুলুপিসির বাস । নবু'র ঠোঙা বানানোর দোকানে পিসি কাজ করে সে আজ বহুযুগ হল । দিব্যি হাতের কাজ- নিখুঁত সুন্দর; পাহাড় প্রমাণ কাগজ কেটে আঠা সেঁটে পিসি শয়ে শয়ে ঠোঙা বানাচ্ছে রাতদিন। হাসিমুখে কথা বেশী নেই- শুধু চোখ আর হাত চলে একনাগাড়ে।অর্ডার মত পিসির কাজ সময়ের আগেই ডেলিভারির জন্য রেডি - নবু আদর করে পিসিকে ডাকে দশভূজা পিসি।

মেয়ে দুগ্গা ছাড়া সংসারে পিসির কেউই প্রায় নেই। সেই দুগ্গাকে কখনো কাছছাড়া করার ইচ্ছে ছিল না পিসির। মা মেয়ের সংসার - যাহয় টানাটানি করে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু ঘোষাল গিন্নি এসে মাস দুই আগে একেবারে নাছোড়বান্দা হয়ে ঝুলে পড়ল '' ও ফুলু, দে না তোর দুগ্গাকে লক্ষ্মীমা আমার। তুই তো জানিস, আমার ছোটমেয়েটার বে' হয়েছে কোলকেতায় ; মেয়ে আমার পোয়াতি। মস্তঘরের গিন্নি সে, মাথায় হাজার কাজের ভার। বাপের ঘরে এসে কটাদিন যে বিশ্রাম নেবে, সে জো নেই। তোর দুগ্গাকে দে না সোনা বছরখানেকের জন্য - হাতে হাতে একটু সাহায্য করলে , মেয়েটার আমার একটু কষ্ট কমে ।''
ফুলুপিসি তবু বলে ''ও মেয়ে বড় মা-ন্যাওটা গো গিন্নিমা - ওকে দু'দিনের বেশী তিনদিন ধরে রাখতে পারবে না ....''
-:ওরে একটা তো মোটে বছর, দেখতে দেখতে কেটে যাবে দেখবি; কত্ত বড় ঘর, কত ঘটা, আরাম আয়েস, খাওয়া-পরা, কত্ত আনন্দ আহ্লাদ - অভাব দুয়ার পেরিয়ে ভিতরে সেঁধাবার জো নেইকো।''

অগত্যা রাজি হয় মা মেয়ে - ফুলুপিসি সতেরো বছর পর আবারও একবার নাড়ী ছেঁড়ার যণ্ত্রণা পেল নিঃশব্দে নীরবে। তারপর থেকেই ফুলুপিসি কাগজ কাটার আগে ভালো করে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় কাগজে - কোলকাতার ছবি আর খবর পেলে যত্ন করে পড়ে - তারপর কাগজ কাটে।মনে মনে নিজেই হাসে আর ভাবে, ''আচ্ছা আমার মেয়েকে কাগজের পাতায় কেন খুঁজে মরি? তার কথা কি কাগজে নেকা থাকবে?'' নিজেই মুচকি হেসে নিজের পাগলামিকে মৃদু ধমক দেয় ''মরণ''।

অভ্যাস বশে পিসি কাগজ কাটতে বসে আজও চোখ বোলাচ্ছিল পুরানো একটা কাগজের পাতায়; নিজস্ব প্রতিনিধির কলমে হঠাৎ চোখ আটকে গেল ছোট্ট এক টুকরো খবরে - শিরোনাম ''মৃন্ময়ী ও চিন্ময়ীর যুগলে ভাসান ''।নীচে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা -
শহরের গঙ্গাঘাটে গতরাতে প্রতিমা নিরঞ্জন মুহূর্তে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা ; দুগ্গা নামে মফঃস্বলের এক কিশোরী তথা শহরের গৃহ-পরিচারিকা হল শোচনীয় মৃত্যুর শিকার। ডুবুরি ও মিউনিসিপ্যালিটির কর্মীদের যৌথ উদ্যোগে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার হয়।খবর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অসুরের পা ও সিংহের কাঠামোর মাঝে আটকে ছিল তার মাথা এবং ডানহাতের মুঠোয় ধরা ছিল দেবীপ্রতিমার পরনের মহার্ঘ্য শাড়ীর একখন্ড। ময়নাতদন্তের প্রয়োজনে তার মরদেহ সরকারি হাসপাতালে প্রেরিত হয়।পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ সূত্রে জানা যায় কিশোরী মফস্বলবাসী তার দরিদ্র মা'কেও সাজাতে চেয়েছিল দুর্গাপ্রতিমার মত এমন ঝলমলে সোনালীবস্ত্রে।গতরাতে দেবীবিসর্জনের ভীড়ে শেষ মুহূর্তে সেও জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেবীর মহার্ঘ্য পরিধেয় খুলে আনার মানসে কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ প্রতিমার বিপুলভারে তার সলিলসমাধি হয় মর্মান্তিক ভাবে।

Comments

Popular posts from this blog

Drawing , page 1

Sunita Mukherjee , from Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Madhumonti Paul , from Kalpography Phtotography and Drawing Department of Mrittikaparibar Drawing - Ruhul Amin , From Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Drawing - Adarsha Mondal , from Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Drawing - Tanmay Sinha , From Kalpography , Photograpy and Drawing Dept. of Mrittikaparibar drawing - Ankita Maji, from - Kalpography ( Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar )

বিসর্জন - আশিষ মেটে

ক্ষত বিক্ষত পাহাড় মাকড়সা জালে ঢাকা, রক্তস্রোত নদী, মৃত অরণ্যের চিত্র লেখা । শরৎ মেঘে নকশা ছবি, ভাসে ছোট্ট মেয়ের মুখ; বারুদে গন্ধে দম বন্ধ, ফেটে যাচ্ছে বুক; জ্বলন্ত শরীরের চলন্ত গুলির আওয়াজ, থমকে দাঁড়ায় কান্না তাঁর থামে না; ক্ষমা করিস মা, নিয়ে যেতে পারলাম না তোর পূজার সাজ- ছোট্ট মেয়েটি বার বার জিজ্ঞাসা, বাবা কবে আসবে মা? পুষ্পাঞ্জলি শেষ, চোখের জলে দুর্গামা; দিনের প্রতিটা মুহূর্তে আতঙ্ক; যোগ মেলে না জীবনের শেষ পৃষ্ঠার অঙ্ক । বিসর্জন বেদনার গান হৃদয়ের বাজে; ভারতমাতার দীপ  জ্বালিয়ে ঘরে ফিরলো তেরঙা সাজে।।

এসো চিন্ময়ী মা - মৌলী বণিক

অশ্রুরঙের ছবি দেখি কেন মা দুর্গা তোর চোখে? সব রঙ হারিয়ে তুই ডুবেছিস কি হতাশ শোকে? সভ্য পৃথিবী কক্ষগতি বদলে ছুটছে আদিম অন্ধকারে- স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ধর্ষিত গুহামানবের হিংস্র হুহুঙ্কারে। ধিকিধিকি রোষানলে জ্বলছে দেখি পাপভারে ন্যুব্জ ধরা, তবু ধম্মনেতাদের রক্তচক্ষু ভয়ে ধম্মজুজুরা আধমরা। নারীর শালীনতা ঘোমটা বোরখা কিছুই আজ রক্ষিত নয়; মহিষাসুররা রক্তবীজের বংশ- ধর্ষণ, হত্যায় লেখে পরিচয়। অনাচার ভ্রষ্টাচারের ধারা বিবরণী জমে ধূসর হয় পান্ডুলিপি অসহায় হতাশায় দলাদলি মারামারি- নাম দেই বিধিলিপি। কাদা ছোঁড়াছুড়ি, মিথ্যের চমক জাদুগরী, কথার ফুলঝুরি তাতে আর কিছু না হলেও হয় নেতার বৈভব ও রাজপুরী। ভক্তের মুখোশ পরা এসেছে যারা মৃন্ময়ী রূপে প্রণাম করে, রাতের আঁধার ঘরে সেই চিন্ময়ীরূপকে ক্রূশবিদ্ধ করে । দূর্গতিনাশিনী তোর বিলাসী দশভুজা সংহারী রূপ চাইনা মাগো, মন্দির বাইরে এই সমাজে দ্বিভুজা চিন্ময়ী রূপে মা তুমি জাগো।