Skip to main content

পড়ো এবং অন্যকে পড়াও কলমে পদ্মাবতী মন্ডল

তেরো পেড়িয়ে চোদ্দতেই ঋতুমতী হয়েছে কমলা, ওর কাপড়ে রক্তের দাগ দেখেই রে রে করে তেড়ে উঠলো ওর দিদি ঠাকরূণ, দিদি ঠাকরূণ মানে হচ্ছে কমলার ঠাকুমায়ের শ্বাশুড়ী মা, বয়স পঁচাশি ছুঁয়ে গেছে এখনো গলার বাজখানি শুনলে বাড়ীর আমড়া গাছটোতে কাকচিল বসে না, আঁটোসাঁটো আটপৌরে শাড়ী পরে বাড়ীর চারদিকে গাছপালা নোংরা আগাছা সাফসোতরন করেন, এমনিতে ভালো মানুষ তবে মেয়েদের প্রতি একটু হিংসুটে, সেটা স্বভাবজাত, কেজানে কেন বাড়ীর মেয়েদের প্রতি এত তিক্ততা ওনার, কোনো কিছুই নরম গলায় বলেন না, সবটা যেন মারমার কাট কাট--

"বলি ওও মুখপুড়ি... ইদিকে আয় দেহিনি !!! হায় হায় হায় এই আধ-দামড়া বিটিছ্যালাডারে আহোনো বাপের বাড়ী থুয়ে দিসে!!! খুঁটি পুজবে ভাবছে লেকি?? তুকে কী গোঁজে বুড়ুবে?? তুর মতন বয়সে আমার তিনটে ছেলেমেয়ে হয়েগেছুলো, আর তুই কিনা এই ভরা লদী লিয়ে বাপের ঘরে পড়ে আচিস?? ওরা নাহয়ত ব্যাটা ছেলে তাই বলে তুর মা'ও দেখেলাই!! শাড়ীটো সাপটে গেয়েছে রক্ত তে, ছ্যা ছ্যা ইমন মেয়েছেলে মা তুমি!! একটু সন্তপ্প নাই মা "

কমলা থতমত খেয়ে গেল, প্রথম বার ঋতুমতী হয়েছে তাই নিয়ম কানুন অত জানা নেই তাই মায়ের ঘরপানে যাচ্ছিল সবকিছু শুধিয়ে নিতে হঠাৎ দিদিবুড়ির ডাকে পিলে চমকে গেল -

"ঠানদিদি আমি কী কিছু ভুল কল্লাম??"

"ভুল কললি!! তা কী আর বলতে?? আজ তুর বাবা ফিরুক আমি কতা কয়ে নেবো ক্ষণ, ইখন যা।।আর শুন... আমার ঘর সিঁধুবিনি, তোর মায়ের ঘর থেকে একটা নেঙড়া কানি লিয়ে লিজের ভরা পেলাবনে বাঁধ দে, আর কান খুলে শুনে রাখ ঠাউর ঘরে আজ থেকে চারদিন পা রাখবিনে"

কমলার মা শাড়ীতে মুখ ঢেকে দিদি শ্বাশুড়ির কথা শুনছিলেন, মেয়েকে টেনে ঘরে নিয়ে গিয়ে নরম পাতলা কাপড় কোমড়ের কারের সাথে জড়ানো শিখিয়ে দিলেন, মেয়েও দিব্য মায়ের কথা মত প্রথম বারেই শিখেনিল, পেটের ভেতর টা মোচড় দিয়ে উঠছিল কেমন ব্যাথা ব্যাথা ভাব, সারাদিন কাটানোর পর সন্ধ্যে বেলায় বাবা জেঠুরা বাড়ী ঢুকলো সবমিলিয়ে কুড়ি জনের সংসার ঠানদিদি বেঁচেবর্তে আছেন তাই সংসারে আজ‌ও একহাঁড়িতে ভাত হয়, সকলের খাওয়া দাওয়া শেষে যখন রোয়াকে বসে গল্প গুজব চলছে তখন ঠানদিদিই কথা খানা পাড়লেন-

"বলচি আমার একখান কতা ছুলো, তোমাদের কাচে, যদি সম্মতি দাও তাইলে ক‌ইতে পারি"

সবাই এ ওর ঘাড়ে মুখ লুকোলো। বড়নাতি অর্থাৎ কমলার বাবা বলে উঠলো " একি কী ক‌ইছো ঠাকুমা!! তুমি কতা বলবে তাও আমাদের সম্মতি দিতে হবে নাকি?? কী বলবে বলো"

"তোমার কমলার জন্য পাত্তর দেখিচি, ন'গাঁয়ের শিবু চক্কোতির ছেলে, দোজবরে বটে তবে এহোনো বিয়ের বয়স আচে, চল্লিশ ব‌ই তো নয়, ছেলেদের উটুকু বয়স কেউ দেখেনা, কমলার সাথে সাজন্ত হবে বেশ, আর মেয়েডারো তো বয়স কমছে না!! এখন বিয়ে না দিলে পরে লোকে থুতু দেবে"

সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে র‌ইল, কমলার মায়ের ইচ্ছে ছিলনা এই কথাতে , কিন্তু একহাত ঘোমটার আড়ালে মুখ ঢেকে স্বামীকে চোখ ইশারা করা বড্ড মুশকিল, আর নিজে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে তো আবার রক্কে নেই, তাই মেয়ের অধিষ্ঠের কথা ভেবে চুপ থাকায় বুদ্ধিমানের কাজ, এদিকে ঠানদিদির মুখের উপড় কথা বলবে এমন সাধ্য কারোর নেই, সবাই মাথা নিচু করে সম্মতি জানালো, ঠানদিদিও বেশ খুশি, পরের দিন সকালে বাড়ী ঝাঁটপাট শুরু হয়ে গেল, আজ নাকি শিবু চক্কোতির বাড়ী থেকে লোক আসবে, বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ সবাই এল, বাড়ীর ছেলেরাও তখন বাড়ীতে, কথা মোটামুটি পাকা, কিন্তু ওদের কথার মাঝখানে একজন লোক কথা বলার দৃষ্টতা দেখালো সবাই তো অবাক এ আবার কে!!! ঠানদিদি আগেও দেখেছে লোকটাকে সবসময় সাদা ধবধবে ধুতি পরে থাকে, একটা ব‌ই আর ছড়ি নিয়ে সকাল বেলা গ্রাম চক্কর কাটে, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে দের লেখাপড়া শেখায়, গরীব দের খেতে দেয়, আর কিসব খাতায় লিখে বেড়ায়। আজ হঠাৎ ওদের বাড়ীতে কেন?? ঠানদিদি লোকটির সামনে গিয়ে বললেন

"যা ক‌ওনের আচে আমারে ক‌ও, আমি এ বাড়ীর মল্লান, আমার হুকুম চলে এবাড়িতে"

সাদা ধুতি আর একমাথা টাক নিয়ে অত্যন্ত নম্রতার সঙ্গে লোকটি বললো -

"মার্জনা করবেন আপনার মালিকানা তছরুপি বা হস্তান্তর,  কোনোকিছুর বাসনাই আমার নেই, আমি শুধু একটা আবেদন নিয়ে এসেছি, যদি এই বাসনা মেনে নেন তাহলে বাধিত থাকিব"

এত গুরুগম্ভীর বাংলা শুনে সবাই হতচকিত হয়ে মানুষটার দিকে তাকালেন, না তেমন কিছু চোখে পড়েনি সেদিন তবে ওনার জ্যোতির্ময় চোখের দিকে তাকানো যায়নি বেশিক্ষণ, ওনার মুখের উজ্জ্বলতায় সবার চোখে ধাঁধা লাগছিল, শিবু চক্কোতি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন

"কিছু যদি মনে না করেন একটা কথা বলবো??"

চশমার কাঁচটা পুনরায় চোখে আটকে বললেন " আপনি আমাকে একহাজার প্রশ্ন করতে পারেন, আমি উত্তর দেবো বিনিময়ে এই নারকীয় খেলা বন্ধ করতে হবে"

 শিবু চক্কোতি জিভ কেটে কানে আঙ্গুল দিয়ে বললেন "আমি ভুলে গিয়েছিলাম বীরসিংহী তে দাঁড়িয়ে আছি, এখানে সিংহশিশুর গর্জনে অন্যায় মাথা নত করে, আর ন্যায়ের পতাকা পতপত করে আকাশ ছোঁয়, আমাকে ক্ষমা করবেন আমি আপনার অভিপ্রায় বুঝতে পেরেছি, কমলা এখনো অনেক ছোটো, ওকে আরো কিছু দিন সময় দেওয়া দরকার"

"প্রশ্ন টা শুধু কমলা কে নিয়ে নয় আরো অনেক কমলা দিনে রাতে বলি হয়ে যাচ্ছে, এসব বন্ধ হ‌ওয়া দরকার, ছিঃ ছিঃ ধিক এই কুপ্রথাকে, সমাজের এখনো অনেক শিক্ষার অভাব, মানুষ বড্ড অশিক্ষিত, এই  নারকীয় হত্যালীলা বন্ধ হোক, কিছুতেই আর এভাবে ফুল ছিঁড়তে দেওয়া যাবেনা"

বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সেই কথা শুনে কমলা সেদিন রেহাই পেয়েছিল, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সেই তেজদীপ্ত কন্ঠস্বরে ঠানদিদিও চুপ করে গিয়েছিলেন।সে আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা, তখন তিনি আমাদের মাঝে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু আজ আর তিনি নেই.....

তবে তিনি পুনরায় জন্মেছেন প্রতি কন্যার পিতারূপে, আজ‌ও পৃথিবীর প্রতিটা কোনায় বিদ্যাসাগর আছেন, আজ এক নতুন পৃথিবীর শুভ সুচনা ঘটছে দিকে দিকে, আজ আর ঋতুমতী হলেও অন্তত বিয়ের কথা ভাবা হয়না সবার আগে।আজ আর মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করার কথা শোনা যায়না, মানুষ এখন বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও স্লোগান দেয়, অনেক খানি উন্মোচিত হয়েছে সমাজ। অনেক বদলেছে, তবে খারাপ জিনিস আগেও ছিল এখোনো আছে, সবসময় খারাপের কথাটা নাই বা তুলে ধরলাম!! আজ হিমা দাস, পি ভি সিন্ধু, সাইনা নেওয়াল, মেরি কোম এই নামগুলো পিতৃপদবী তেই জ্বলজ্বল করছে, কারনটা অবশ্যই মেয়ের পিতা, প্রতি পিতার মধ্যে বিদ্যাসাগরের বাস, তিনি জগৎ মাঝে এভাবেই বেঁচে থাকুন, আমাদের যে ওনাকে পিতা রূপেই প্রয়োজন ছিল, প্রনাম হে পিতা, জন্মতিথিতে আপনার পায়ে সহস্রাধিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।।

Comments

Popular posts from this blog

Drawing , page 1

Sunita Mukherjee , from Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Madhumonti Paul , from Kalpography Phtotography and Drawing Department of Mrittikaparibar Drawing - Ruhul Amin , From Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Drawing - Adarsha Mondal , from Kalpography Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar Drawing - Tanmay Sinha , From Kalpography , Photograpy and Drawing Dept. of Mrittikaparibar drawing - Ankita Maji, from - Kalpography ( Photography and Drawing Dept. of Mrittikaparibar )

বিসর্জন - আশিষ মেটে

ক্ষত বিক্ষত পাহাড় মাকড়সা জালে ঢাকা, রক্তস্রোত নদী, মৃত অরণ্যের চিত্র লেখা । শরৎ মেঘে নকশা ছবি, ভাসে ছোট্ট মেয়ের মুখ; বারুদে গন্ধে দম বন্ধ, ফেটে যাচ্ছে বুক; জ্বলন্ত শরীরের চলন্ত গুলির আওয়াজ, থমকে দাঁড়ায় কান্না তাঁর থামে না; ক্ষমা করিস মা, নিয়ে যেতে পারলাম না তোর পূজার সাজ- ছোট্ট মেয়েটি বার বার জিজ্ঞাসা, বাবা কবে আসবে মা? পুষ্পাঞ্জলি শেষ, চোখের জলে দুর্গামা; দিনের প্রতিটা মুহূর্তে আতঙ্ক; যোগ মেলে না জীবনের শেষ পৃষ্ঠার অঙ্ক । বিসর্জন বেদনার গান হৃদয়ের বাজে; ভারতমাতার দীপ  জ্বালিয়ে ঘরে ফিরলো তেরঙা সাজে।।

এসো চিন্ময়ী মা - মৌলী বণিক

অশ্রুরঙের ছবি দেখি কেন মা দুর্গা তোর চোখে? সব রঙ হারিয়ে তুই ডুবেছিস কি হতাশ শোকে? সভ্য পৃথিবী কক্ষগতি বদলে ছুটছে আদিম অন্ধকারে- স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ধর্ষিত গুহামানবের হিংস্র হুহুঙ্কারে। ধিকিধিকি রোষানলে জ্বলছে দেখি পাপভারে ন্যুব্জ ধরা, তবু ধম্মনেতাদের রক্তচক্ষু ভয়ে ধম্মজুজুরা আধমরা। নারীর শালীনতা ঘোমটা বোরখা কিছুই আজ রক্ষিত নয়; মহিষাসুররা রক্তবীজের বংশ- ধর্ষণ, হত্যায় লেখে পরিচয়। অনাচার ভ্রষ্টাচারের ধারা বিবরণী জমে ধূসর হয় পান্ডুলিপি অসহায় হতাশায় দলাদলি মারামারি- নাম দেই বিধিলিপি। কাদা ছোঁড়াছুড়ি, মিথ্যের চমক জাদুগরী, কথার ফুলঝুরি তাতে আর কিছু না হলেও হয় নেতার বৈভব ও রাজপুরী। ভক্তের মুখোশ পরা এসেছে যারা মৃন্ময়ী রূপে প্রণাম করে, রাতের আঁধার ঘরে সেই চিন্ময়ীরূপকে ক্রূশবিদ্ধ করে । দূর্গতিনাশিনী তোর বিলাসী দশভুজা সংহারী রূপ চাইনা মাগো, মন্দির বাইরে এই সমাজে দ্বিভুজা চিন্ময়ী রূপে মা তুমি জাগো।